মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ভাষা ও সংষ্কৃতি

         খাগড়াছড়ি সদর উপজেলায় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বাস । ইহা ১টি ভিন্ন ভাষাভাষী উপজাতি অধ্যুষিত পাহাড়ী অঞ্চল । প্রত্যেকের ভাষা ও সংস্কৃতি পৃথক । প্রত্যেকটি জাতি বা জনগোষ্ঠীর পৃথক পৃথক বংশ পরিচয় বিদ্যমান । তাদের জীবন যাত্রাও বৈচিত্রময় । চাকমা, মারমা এবং ত্রিপুরা উপজাতিগণ এ অঞ্চলে প্রথম বসবাস শুরু করে | পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে ১৯৭৯ সালে বাঙ্গালী জনবসতি গড়ে তোলে এবং দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাঙ্গালী এসে উপজাতীদের সাথে বসবাস শুরু করে | ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পাহাড়ী-বাঙ্গালী মিলে-মিশে একসাথে বসবাস শুরু করে|

        সমতল অঞ্চল হতে এ অঞ্চলের সামাজিক বিচার, আইন, শাসন, সংস্কৃতি, ও ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ পৃথক। ১৮৬০ খ্রিঃ ব্রিটিশ সরকার এ অঞ্চলকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে | পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ীরা মূলত জুমচাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে । উচুঁ পাহাড়ের জঙ্গল আগুনে পুড়িয়ে চাষাবাদের উপযোগী করত ধানসহ বিভিন্ন শাক-সব্জি, ফল-মূলের চাষাবাদ করাকে জুম চাষ বলে । এখানে রাজ প্রথা, হেডম্যান এবং কার্বারী রয়েছে | গ্রামের প্রধানকে কার্বারী বলে এবং মৌজা প্রধানকে হেডম্যান বলে । কার্বারী পাড়া/গ্রাম পর্যায়ে ছোট-খাট সামাজিক সালিস/বিচার করে থাকে । হেডম্যান মৌজার রাজস্ব আদায় করেন, মৌজার সম্পদ সংরক্ষণ করে, মৌজার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখেন ও জমি-জমার প্রতিবেদন দেন । হেডম্যান  আদালত হিসেবে সামাজিক বিচার-আচার করে থাকেন । হেডম্যান ২৫ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন । হেডম্যানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সার্কেল চীফের নিকট আপীল করতে হয় এবং তিনি ৫০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন | পার্বত্য এলাকায় ০৩ জন রাজা আছেন । খাগড়াছড়ি জেলার রাজ প্রথার মধ্যে মং সার্কেল চীফ, রাঙ্গামাটিতে চাকমা সার্কেল চীফ এবং বান্দরবান পার্বত্য জেলাতে বোমাং সার্কেল চীফ রাজা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন | কার্বারী, হেডম্যান, সার্কেল চীফ/রাজারা সরকার হতে মাসিক ভাতা পেয়ে থাকেন এবং প্রজাদের খাজনা হতে কিয়দংশ হেডম্যান ও রাজারা পান ।  খাগড়াছড়ি সদর উপজেলায় ৩টি উপজাতি সম্প্রদায় বাস করে । তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ

 

          ক) চাকমা : দ্বাদশ শতাব্দীতে প্রথম চাকমা শব্দের অস্তিত্ব এবং ষোড়শ শতাব্দীতে এ অঞ্চলে এ নামের একটি জনগোষ্ঠীর বসবাসের তথ্য পাওয়া যায় । এই চাকমা জাতিগোষ্ঠী শাব্দিক বা উচ্চারণগত দিক থেকে যাই হোক না কেন এরাই যে বর্তমানে চাকমা নামে পরিচিতি জনগোষ্ঠী তাতে কোন সন্দেহ নেই। চাকমারা মূলতঃ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং বিজু তাদের প্রধান সামাজিক উৎসব। চাকমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী জুম নৃত্য দেশে-বিদেশে দারুণভাবে প্রশংসিত। তুলনামূলকভাবে চাকমারা অধিক শিক্ষিত। তবে চাকমা উপজাতীয় রমণীরা অত্যন্ত কর্মঠ ও পরিশ্রমী । চাকমাদের মধ্যে প্রচলিত কথ্য ভাষার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে স্পষ্টত প্রমাণিত হয় যে, তা বাংলা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষারই অপভ্রংশ। চাকমারা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অপভ্রংশের মতো উচ্চারণ রীতি ব্যবহার করলেও চাকমা ভাষার বর্ণমালা বর্মী আদলে তৈরী। ব্রিটিশ আমলে কর্মরত চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মিঃ জিন বিসম ০৫ অক্টোবর ১৮৭৯ সালে রাজস্ব বোর্ডের নিকট লিখিত পত্রে উল্লেখ করেন, চাকমাগণ অর্ধ বাঙ্গালী । বস্ত্তত ইহাদের পোশাক পরিচ্ছদ এবং ইহাদের ভাষাও বাংলা ভাষার বিকৃত রূপ মাত্র । এত ভিন্ন চাকমাদের উপাধি ভিন্ন নামগুলোও এমন বাঙালী ভাবাপন্ন যে, তাহাদিগকে বাঙালী হইতে পৃথক করা একরূপ অসম্ভব।

 

         খ) মারমা :  পার্বত্য জেলাসমূহে মারমারা সংখ্যায় দ্বিতীয় হলেও খাগড়াছড়িতে এরা তৃতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ উপজাতি । বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলাতেই মূলতঃ এদের বসবাস । মারমারা অত্যন্ত অতিথি পরায়ন । এ জনগোষ্ঠীর মেয়েরা অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন। তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং তাদের প্রধান সামাজিক উৎসব সাংগ্রাই । সাধারণত মারমা বর্ষপঞ্জি ঘোষণাপত্র সাংগ্রাই এর মাধ্যমে চান্দ্রমাস অনুসারে মারমারা তাদের সামাজিক উৎসব সাংগ্রাই পালন করে থাকে । বহু পূর্বে মারমারাও মগ নামেই পরিচিত ছিল । বর্তমানে তারা নিজেদের মারমা বলেই দাবি করে। মারমা শব্দটি মারমাজা বা ম্রাইমা নামক উপমহাদেশীয় প্রাচীন ব্রাহ্মী হস্তাক্ষর লিপি থেকে উদ্ভুত । স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে সরকারিভাবে মারমা জনগোষ্ঠী স্বতন্ত্র উপজাতি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে ।

         মারমা ভাষার নিজস্ব হরফও আছে । এ বর্ণমালা ও মারমাজা বা ম্রাইমাজাহ নামে পরিচিত । ১৩টি স্বরবর্ণ ও ৩৬ টি ব্যঞ্জনবর্ণ নিয়ে প্রণীত বর্ণমালা ভারতের ব্রহ্মী ও খরেষ্ট্রী লিপি হতে উদ্ভুত । মারমারা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হলেও তারা অন্যান্য উপজাতীয়দের ন্যায় দেবতা ও অপদেবতায় বিশ্বাসী । তবে বৌদ্ধ ধর্মের অন্যান্য উৎসব পার্বণাদিও তারা পালন করে থাকে । মারমা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী থালা নৃত্য, প্রদীপ নৃত্য, পরী নৃত্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় ।

 

        গ) ত্রিপুরা :  পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ত্রিপুরারাই ইতিহাস সমৃদ্ধ জাতি । খ্রিষ্টাব্দ গণনার বহু পূর্ব হতেই এ অঞ্চলে ত্রিপুরাদের অস্তিত্ব ছিল । মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী অংশ নিয়েছিল বলে জানা যায় । ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা রাজা যুঝারুফা কর্তৃক বঙ্গ বিজয়ের পর স্মারক হিসেবে ও ত্রিপুরাই প্রর্বতনের পর হতে ত্রিপুরাদের লিখিত ইতিহাসের সূচনা ঘটে। সঠিক তথ্য জানা না গেলেও বহু আদিকাল থেকে এ অঞ্চলে ত্রিপুরাদের বসবাস ছিল । অধ্যাপক শাহেদ আলী তাঁর বাংলা সাহিত্যে চট্টগ্রামের অবদান বইয়ে লিখেছেন- পাহাড়ী জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ত্রিপুরারাই সবচেয়ে সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী। ত্রিপুরারা সনাতন ধর্মাবলম্বী । তাদের প্রধান উপজীবিকা কৃষি তথা জুমচাষ । তাদের প্রধান উৎসব বৈসাবী। উপজাতি প্রায় সকল রমণীরাই নিজেদের তৈরি তাঁতে বোনা কাপড়  পড়ে । এদের পরনের কাপড়কে রিনাই ও রিসাই বলে । রুপার তৈরি অলংকার ত্রিপুরা রমণীদের খুবই প্রিয় । সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী অত্যন্ত সমৃদ্ধ । ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী গড়াইয় ও বোতল নৃত্য অত্যন্ত প্রশংসনীয় । ত্রিপুরাদের মধ্যে রোয়াজা উপাধিধারীরাই সামাজিক বিচার আচার করে থাকে ।