মেনু নির্বাচন করুন

হেরিটেজ পার্ক, খাগড়াছড়ি

পৃথিবীর সকল জাতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রত্যেক জাতি বা জনগোষ্ঠীর পৃথক বংশ পরিচয়-ইতিহাস রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১৩ টি উপজাতির জীবন যাত্রা স্বতন্ত্র, বৈচিত্রময় কিন্তু সহজ সরল। এই  আদিবাস সমূহের মধ্যে চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমা পর্যায়ক্রমিক সংখ্যাগরিষ্ঠ।
ক) চাকমা : কোন কোন পন্ডিতদের মতে “চাকমাং” শব্দটি হতে ‘চাকমা’ শব্দের উৎপত্তি। আরাকানীরা শাক্যবংশকে “চাকমাং” বলতেন। এ চাকমা শব্দটির অর্থ আমরা পাই “চাক” অর্থ শাক্য আর “মাং” শব্দের অর্থ রাজবংশ। সুতরাং এর অর্থ শাক্য রাজ বংশ। চাক্মারাও নিজেদের শাক্য বংশ দাবী করেন।
শাক্য জাতিকে মগেরা বলত “শাক” বা “চাক”। যারা শাক্য রাজবংশীয় তাদেরকে বলত “শাকম্যাং”। “ম্যাং” শব্দের অর্থ রাজা । অর্থাৎÑ শাক্য রাজবংশীয়। কিন্তু বাঙ্গালি গ্রন্থাচার্য্য ব্রাহ্মণগণ চম্পক নগর বাসী বলে চাম্পা বা পরিশেষে “চাকমা” নামে অভিহিত হয়ে ছিলেন। (শ্রী শ্রী রাজ নাম- ২১ পৃষ্ঠা )
রাজা ভূবন মোহন রায় প্রাচীন রাজবংশের ইতিহাসে দেখা যায়, মগ ভাষায় “চাক-চেক” অর্থ শাক্য এবং যারা শাক্যরাজবংশীয় তাদেরকে বলা হত চাকম্যাং অর্থাৎ শাক্য রাজবংশীয়। ব্রহ্ম ভাষায় ম্যাং শব্দের অর্থ রাজা, এই চাকম্যাং বা চাকমাং হতে রূপান্তরে এখন চাকমা হয়েছে। (চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত -২৫ পৃষ্ঠা)
মতান্তরে কর্ণ তালুকদাদের বামুনী লেখা হতে “রাজবংশাবলী” পুঁথির তথ্যে জানা যায়, রাজা বিজয় গিরির আরাকান (অক্রাদেশ) অভিযানের পর চাকমা রাজারা রাজ্যাভিষেক শ্বেত হস্তীর দ্বারা এবং বিভিন্ন কাজে হস্তীর ব্যবহারের প্রাচুর্য্যে সম্পন্ন করতেন বলে ব্রহ্মদেশে চাক্মাদের চাং ম্যাং নামে আখ্যায়িত করতেন। ব্রহ্মদেশীয় ভাষায় চাং অর্থে হাতী আর ম্যাং অর্থে রাজা এই শব্দদ্বয় হতে ‘চাকমা’ নামের আদি উৎসের পরিচয় ভিত্তি বলে এতে উল্লেখ পাওয়া যায়। (চাক্মা জাতির ইতিবৃত্ত- ২৬ পৃঃ)। সতীশ চন্দ্র ঘোষ চাকমা বৌদ্ধদের শরীরের গঠন সম্পর্কে বলেছেন এদের মুখমন্ডল গোলাকার নাসিকা নত ও চেপ্টা, গন্ডদেশের অস্থি উন্নত, বহ্ম প্রশস্ত বাহুযুগল মাংসল জংগাদেশ অতিশয় স্থল ও সুদৃৃঢ় অক্ষি গোলকের কপিলাভাস এবং বক্র দৃষ্টি ইত্যাদি নিয়ে শরীর বেশ হৃষ্ট Ñ পুষ্ট, বলিষ্ঠ ও সুদৃঢ় বটে কিন্তু সুগঠিত নয়।
হুমায়ুন আজাদ চাকমাদের শরীরের গঠন সম্পর্কে বলেছেন  আকালে খাটো, চুল কালো, চোখ সরু আর কপালে অস্থি উচ্চ।
কুশল রাজ প্রসেনজিতের পুত্র বিড়–ঢ়কের আক্রমণে শাক্যবংশ কপিলাবস্তু হতে বিতাড়িত হন। ক্রমে ক্রমে দেশ-দেশান্তরে বসতি স্থাপন করে ঘুরতে ঘুরতে চতুর্থ কি পঞ্চম শতাব্দীতে চম্পক নগরে বসবাস করতে থাকেন। এই চম্পক নগর বর্তমানে ভারতে ত্রিপুরা রাজ্যে ভাগলপুরে অবস্থিত। কাল ক্রমে এই শাক্য বংশ শক্তিশালী হয়ে উঠে। কথিত আছে, চম্পক নগরের রাজা সম্বুদ্ধের বিজয় গিরি ও উদয় গিরি নামে দুই পুত্র ছিল। তাঁর এক সেনা পতির নাম নিয়ে চট্টগ্রামে আরাকান রাজার বিরুদ্ধে অভিযান চালান। এ অভিযানে কুমার বিজয় গিরি জয়লাভ করেন। এ দিকে তাঁর পিতার মৃত্যু হলে ছোট ভাই উদয় গিরি রাজসিংহাসনে আরোহন করেন। তিনি  খবর জ্ঞাত হয়ে চম্পক নগরের রাজধানীতে ফিরে না গিয়ে চট্টগ্রামে বিজিত রাজ্য শাসন করেন।
খ) মারমা: পার্বত্য জেলাসমূহে মারমারা সংখ্যায় দ্বিতীয় হলেও খাগড়াছড়িতে এরা তৃতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ আদিবাসী। বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলাতেই মূলত: এদের বসবাস। মারমারা অত্যন্ত অতিথিপরায়ন। এ জনগোষ্ঠীর মেয়েরা অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন। তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং তাদের প্রধান সামাজিক উৎসব ‘‘সাংগ্রাইং’’। সাধারণত: মারমা বর্ষপঞ্জি ঘোষণাপত্র ‘‘সাংগ্রাইংজা’’ এর মাধ্যমে চান্দ্রমাস অনুসারে মারমারা তাদের প্রধান সামাজিক উৎসব ‘‘সাংগ্রাইং’’ পালন করে থাকে। বহু পূর্বে মারমারা ‘‘মগ’’ নামেই পরিচিতি ছিল। বর্তমানে তারা নিজেদের ‘‘মারমা’’ বলেই দাবি করে। ‘‘মারমা’’ শব্দটি ‘‘মারমাজা’’ বা ‘‘¤্রাইমাচা’’ নামক উপমহাদেশীয় প্রাচীন ব্রাহ্মী হস্তাক্ষর লিপি থেকে উদ্ভুত।
মারমা ভাষার নিজস্ব হরফও আছে। এ বর্ণমালা ‘‘মারমাচা’’ বা ‘‘¤্রাইমাজাহ্’’ নামে পরিচিত।  ১৩টি স্বরবর্ণ ও ৩৬টি ব্যঞ্জনবর্ণ নিয়ে প্রণীত মারমা বর্ণমালা প্রাচীন ভারতের ব্রাহ্মী ও খরেষ্ট্রী লিপি হতে উদ্ভুত। মারমারা বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হলেও তারা অন্যান্য উপজাতীয়দের ন্যায় দেবতা ও অপদেবতায় বিশ্বাসী। তবে বৌদ্ধ ধর্মের অন্যান্য উৎসব পার্বণাদিও তারা পালন করে। মারমা জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী থালা নৃত্য, প্রদীপ নৃত্য, পরী নৃত্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
গ) ত্রিপুরা : পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আদিবাসীদের জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে ত্রিপুরারাই ইতিহাস সমৃদ্ধ জাতি। খ্র্স্টিাব্দ গণনার বহু পূর্ব হতেই এ অঞ্চলে ত্রিপুরাদের অস্তিত্ব ছিল। মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধেও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী অংশ নিয়েছিল বলে জানা যায়। ৫৯০ খ্রিস্টাব্দে ত্রিপুরা রাজা যুঝারুফা কর্তৃক বঙ্গ বিজয়ের পর স্মারক হিসেবে ‘‘ত্রিপুরাব্দ’’ প্রবর্তনের পর হতে ত্রিপুরাদের লিখিত ইতিহাসের সূচনা ঘটে। সঠিক তথ্য জানা না গেলেও বহু আদিকাল থেকে এ অঞ্চলে ত্রিপুরাদের বসবাস ছিল। অধ্যাপক শাহেদ আলী তাঁর ‘‘বাংলা সাহিত্যে চট্টগ্রামের অবদান’’ বইয়ে লিখেছেন- পাহাড়ী জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ত্রিপুরারাই সবচেয়ে সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী। ত্রিপুরারা সনাতন ধর্মাবলম্বী। তাদের প্রধান উপজীবিকা কৃষি তথা জুমচাষ। তাদের প্রধান উৎসব ‘‘বৈসু’’। আদিবাসী প্রায় সকল রমণীরাই নিজেদের তৈরি তাঁতে বোনা কাপড় পড়ে। এদের পরনের কাপড়কে ‘‘রিনাই’’, ‘‘রিসাই’’ বলে। রূপার তৈরি অলংকার ত্রিপুরা রমণীদের খুব প্রিয়। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী ‘‘গড়াইয়া’’ ও ‘‘বোতল নৃত্য’’ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ত্রিপুরাদের মধ্যে ‘‘রোয়াজা’’ উপাধি ধারীরাই সামাজিক বিচার আচার করে থাকে।

Share with :

Facebook Twitter